১. আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
ভাবসম্প্রসারণ: মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে বেঁচে থাকতে হয়।
সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের জীবন অর্থহীন। কারণ, সমাজে প্রতিটি মানুষ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি কেবল নিজের কথা ভাবে, সমাজের কথা ভাবে না, সে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক। সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ কখনোই সুখী হয় না। যারা নিজেদের কথা না ভেবে সমাজের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য জীবনকে বিলিয়ে দেয়, তারাই প্রকৃত মানুষ। অন্যের সুখের জন্য যারা ত্যাগ স্বীকার করে, তাদের মতো সুখী আর কেউ নেই। সমাজে এরকম মানুষেরাই চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন।
একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসাই প্রকৃত মানবধর্ম। আজকের এই সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে মানুষের শুভবুদ্ধি ও অন্যের কল্যাণ করার ইচ্ছা। ত্যাগের মাঝেই জীবনের সার্থকতা নিহিত, ভোগের মাঝে নয়।
২. স্বদেশের উপকারে নাই যার মন
কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন।
ভাবসম্প্রসারণ: নিজের দেশকে ভালোবাসার মতো মহান আর কিছু নেই। দেশ মানুষকে আশ্রয় দেয়, অন্ন দেয়, স্বাধীনতা দেয়।
যার নিজের কোনো দেশ নেই, তার মতো দুঃখী আর কেউ নেই। স্বদেশের উপকার করা প্রত্যেকটি নাগরিকেরই কর্তব্য। দেশের কল্যাণ করা মানে নিজের কল্যাণ করা। ইতিহাসে দেখা যায়, স্বদেশকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। কারণ তাঁরা জানতেন, একটি স্বাধীন দেশের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। অন্যদিকে যারা দেশকে কিছু দিতে চায় না বা পারে না, তারা মানুষ হিসেবে ব্যর্থ। হিংস্র পশু যেমন ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিজের সন্তানকেও খেয়ে ফেলতে পারে, তেমনি তারা স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজের দেশকে বিক্রি করে দিতে পারে। এ ধরনের লোকদের সকলেই ঘৃণা করে। তারা কারো কাছে সম্মান পায় না। তারা এক অর্থে পশুর চেয়ে অধম।
স্বদেশের কল্যাণ চিন্তা করাই প্রকৃত মানুষের ধর্ম। স্বদেশপ্রীতি যার নেই সে পশুর সমান। এ-ধরনের মানুষ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
৩. বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
ভাবসম্প্রসারণ: আজকের এই সভ্যতা বিকাশে নারী ও পুরুষের সমান অবদান রয়েছে। নারী ও পুরুষ তাই সমান মর্যাদার অধিকারী।
কেবল পুরুষ কিংবা কেবল নারী থাকলে এ-পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকত না। অনেকে ভুল ধারণা পোষণ করেন, ভাবেন পুরুষ নারীর চেয়ে শক্তিশালী, সভ্যতার বিকাশে কেবল পুরুষের অবদান রয়েছে। অথচ নারীর অবদান পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। সভ্যতার আদিতে কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছে নারী। পুরুষ বাইরের কাজ করলে ঘরের কাজ করেছে নারী। বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই ঘরে-বাইরে সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। তবুও নারীদের আমরা পুরুষের সমান মর্যাদা দিতে চাই না। আমরা ভুলে যাই যে, নারী ও পুরুষ একই বৃন্তের দুটি ফুল। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। নারীর অবদান ও মর্যাদাকে অস্বীকার করা অন্যায়। আমাদের উচিত নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়া এবং একসঙ্গে কাজ করা। এভাবেই দেশ ও জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে।
এই পৃথিবীর উন্নতির পিছনে নারী ও পুরুষের ভূমিকা সমান। তাই নারীকেও পুরুষের সমান মর্যাদার আসনে বসাতে হবে।
৪. নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা?
ভাবসম্প্রসারণ: মাতৃভাষার চেয়ে মধুর ভাষা পৃথিবীতে আর নেই। মায়ের ভাষায় যত সহজে ও সাবলীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়, অন্য ভাষায় তা সম্ভব নয়।
প্রতিটি মানুষই মাতৃভাষায় কথা বলতে আনন্দবোধ করে। স্বদেশি ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলে মনের পিপাসা ততটা মেটে না। জীবনের প্রয়োজনে মানুষকে বিদেশি ভাষা শিখতে হয়। কিন্তু বিদেশি ভাষায় মনের সকল ভাব প্রকাশ করা অসম্ভব। মনের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য তাকে বারবার মাতৃভাষার কাছে ফিরে আসতে হয়। মানুষ তার মাতৃভাষায় চিন্তা করে, স্বপ্ন দেখে। অন্য ভাষা যতই মর্যাদাশীল হোক না কেন, মাতৃভাষার সঙ্গে তার কিছুতেই তুলনা চলে না। বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম জীবনে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ভুল বুঝতে পেরে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন, মাতৃভাষাতেই তা বলতে পেরেছেন।
মাতৃভাষাকে ভালোবাসা আমাদের সকলের দায়িত্ব। অন্যথায় আমরা আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলব। ভাষা ধ্বংস হলে একটি জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। তাই বাঙালি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মাতৃভাষা বাংলাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।